ট্রেন লেট
সালটা ২০০৩। আমি সদ্য বি.এড পাশ করে স্কুল সার্ভিস কমিশনে ইন্টারভিউ
দিয়ে কল্যানীতে একটি স্কুলে চাকরি পেয়েছি। কল্যানী মেইন স্টেশনে নেমে রিক্সা করে মিনিট পনের মত গেলেই স্কুল। কলকাতা থেকে কল্যানী ডেইলি প্যাসেন্জারী করার ব্যাপারটা সবে
সয়ে যেতে শুরু করেছে। অনেকে বলেছিল
কল্যানীতে ঘর ভাড়া নিতে, কিন্তু দিনের শেষে আমার নিজের বাড়িতে, নিজের খাটে না শুলে
ঘুম আসে না। অতয়েব দিনে
প্রায় দের ঘন্টা–দের ঘন্টা তিন ঘন্টা লাগলেও ডেইলি প্যাসেন্জারী অভ্যাস করে নিলাম। আর সত্যি কথা বলতে কি, দেখলাম খুব একটা অসুবিধে হচ্ছে না। স্কুলে আমাদের একটা ৬-৭ জনের দল তৈরী হয়েছে। সবাই কলকাতার দিকে থাকি। কেউ দমদম, কেউ উল্টোডাঙ্গা, কেউ বাগুইআটি। তাই একসাথে হইহই করতে করতে স্কুলে যাওয়া, স্কুল থেকে ফেরা
– সময়টা ভালই
কেটে যাচ্ছে। সামনে পুজো, তাই প্ল্যান চলছে পুজোর ছুটিতে কোথাও যাওয়া যায় কিনা। আমি ছাড়া ২০০৩-এ আরো দুজন জয়েন করেছে, সুমনা আর বিনয়। সুমনার বাড়ি কাঁচড়াপাড়ায়, বিনয়ের মদনপুর। আমাদের থেকে প্রায় দশ বছরের সিনিয়র কয়েকজন দাদা-দিদি আছেন
যাদের সাথে বেশ সখ্যতা গড়ে উঠেছে কিছুদিনের মধ্যেই। আমরা যারা সদ্য চাকরিতে ঢুকেছি, এই সব দাদা-দিদিদের থেকে প্রতিনিয়তই কিছু না কিছু শিখছি
- স্কুলের প্রশাসন সংক্রান্ত, অভ্যন্তরীণ পলিটিক্স সংক্রান্ত, আর অবশ্যই পঠনপাঠন
সংক্রান্ত। কোথাও কোনো
অসুবিধে হলে এঁদের থেকে সব সময়ই সাহায্য পাচ্ছি।
পুজোর ঠিক আগে আগে সেবার খুব বৃষ্টি হলো। স্কুলের সামনেটায় খুব জল জমে। তার ওপর আমাদের আবার মাঝে মাঝেই স্কুলে ঢুকতে
দেরী হচ্ছে তার কারণ কোথায় যেন লাইন সারানো হচ্ছে। পুজোর আগে নাকি এসব সারাইয়ের কাজ প্রায় প্রত্যেক বছরেই হয়,
অফিসের বড়বাবু সুবিমল দেবনাথ সেদিন বলছিলেন। কোনো এক রবিবার স্কুলে একটা সরকারী পরীক্ষার সেন্টার পড়ল আর আমাদের সবাইকে
পরীক্ষার গার্ড দেওয়ার জন্য যেতে হলো। পরীক্ষার কাজ সেড়ে বেরোতে বেরোতে বিকেল হয়ে গেল। স্টেশনে এসে দেখি ট্রেন যথারীতি লেট। স্টেশনে আমি, দেবুদা, কিংশুকদা, মনিরুলদা, সুজয়, চৈতালিদি, আর শর্মিলা চা খেলাম আর ট্রেনের অপেক্ষা করতে লাগলাম। প্রায় আধ ঘন্টা ট্রেন লেট। তবে ট্রেন যখন এলো, দেখলাম রোববার হওয়ার জন্যই হয়তো, বিশেষ ভিড় নেই। হাত পা ছড়িয়ে মুড়ি-চানাচুর খেতে খেতে গল্প করতে করতে বেশ
ভালোই কাটছে, সবাই মিলে
সুজয়ের পেছনে লাগছি: ইদানিং সুমনার সাথে ওকে কয়েকবার স্টেশনে ফুচকা খেতে দেখা
গিয়েছে। এ-কথা সে-কথা
বলতে বলতে সময় কাটছে। ট্রেন
প্রত্যেক স্টেশনে এসে স্বাভাবিকের থেকে একটু বেশি থামছে। এর মাঝে একটা অদ্ভূত ঘটনা ঘটল।
দেবুদা, অর্থাৎ দেবব্রত ভট্টাচার্য, অঙ্ক পড়ায়। দেবুদার সাথে আমার একটা মিল হলো: আমরা দুজনেই খুব সিনেমা দেখতে ভালোবাসি। সিনেমা নিয়ে প্রচুর গল্পও হয়। তা, সেই সময় একটা সিনেমা এসেছিল: “পাতালঘর”। পরিচালকের নাম মনে পড়ছে না। আমি দেবুদাকে জিজ্ঞেস করলাম, “দেবুদা, তুমি পাতালঘর
দেখেছ? এরকম ছবি
কিন্তু বাংলায় এর আগে হয় নি।” এই প্রশ্নটা
করার সাথে সাথে একটা অদ্ভূত ব্যাপার হলো – যার থেকে মূল ঘটনাসমূহের এবং এই গল্পের
সূত্রপাত। দেবুদা আমার
সামনের সিটে বসে আছে, জানলার ধারে। এমনিতেই ছুটির
দিন, ট্রেনে ভিড়
নেই। দেবুদার পাশে
একটু দূরত্বে একজন মাঝবয়সী লোক বসে আছেন। আমি “এরকম ছবি বাংলায় এর আগে হয় নি” বলার সাথে সাথেই তিনি আমার দিকে
দৃষ্টিনিক্ষেপ করলেন এবং ঠায় তাকিয়ে রইলেন। তাকানোটা এতটাই হঠাৎ আর চাহনিটা
এতটাই অদ্ভূত যে আমিও কিছুক্ষণ তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম এই ভেবে যে তিনি হয় তো কিছু
বলবেন। আমার দেখাদেখি
দেবুদাও তাঁর দিকে তাকালো, কিন্তু তিনি কোনো কথা না বলে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন
একটা কৌতুহল এবং সরস বিদ্রুপের অভিব্যক্তি নিয়ে। আমাদের গল্প চলতে থাকলো: পাতালঘর থেকে কথা ঘুরল অন্যদিকে,
মাইনেপত্র কবে বাড়বে, বকেয়া ডিএ কবে পাবো, ইত্যাদি নিয়ে কথা চলতে থাকলো। প্রায় দশ মিনিট কেটে গেছে কিন্তু খেয়াল করলাম
ভদ্রলোকের দৃষ্টি আমার থেকে সরেনি। আমি বাধ্য
হয়েই তাঁকে কিছুটা বিরক্তি সহকারে জিজ্ঞেস করলাম, “কিছু বলবেন?” এর উত্তরে তিনি কিছুটা থেমে বললেন, “আপনি একটা কথা বললেন না একটু আগে?” আমি বললাম, “কোন কথা?”
“ওই যে, কি একটা ফিলিমের নাম করে বললেন না, যে এরকম বই নাকি আমাদের দেশে আগে হয় নি...”
“হ্যাঁ। পাতালঘর।”
“হ্যাঁ, আসলে আমাদের দেশে আগে হয়নি এরকম একটা
কাজের সাথে আমি যুক্ত আছি।”
“কি কাজ?”
“আপনি শুনতে চান?”
“বলুন।”
“আচ্ছা, তাহলে একটু বিস্তারেই বলি। আপনারা কখনো
ভেবে দেখেছেন, যখন ট্রেনে
কেউ টিকিট না কেটে উঠে পড়ে তখন তার কড়া ফাইন হয়, কিন্তু রেলের গন্ডগোল বা লাইনে সমস্যা বা অন্য কোনো প্রবলেমের জন্য যখন
আমাদের অফিসে লেট হয় তখন কিন্তু বসের কটুকথা শুনতে হয় আমাদেরই। রেল কতৃপক্ষ কোনো দায়িত্ব নেয় না, কোনো ধরনের
লিখিত দলিলটুকু দেয় না ট্রেনের লেট হবার জন্য – যেটা বিদেশে অনেক দেশেই করে থাকে। বা হয়তো আপনার কোথাও যাওয়ার তারা রয়েছে: মরণ-বাঁচনের সমস্যা হয়তো...”
বাকি তিনি যা বললেন তার থেকে বোঝা গেল তিনি
দীর্ঘদিন ধরে ট্রেনেদের মাঝে মাঝেই লেট হওয়ার জন্য আন্দোলন শুরু করেছেন। তিনি জগদ্দলের বাসিন্দা। এর আগে নাকি জগদ্দল স্টেশনে সারাদিনে দুটোর বেশি ট্রেন
দাঁড়াতো না; তিনি আন্দোলন করে জগদ্দল স্টেশনকে একটা গুরুত্ত্বপূর্ণ স্টেশনের জায়গায়
পৌছে দিতে সক্ষম হয়েছেন এবং প্রায় সব লোকাল ট্রেনই এখন সেখানে দাঁড়ায়। শুধু তাই নয়, জগদ্দল স্টেশনে নাকি আগে কোনো শৌচালয় ছিল না – তাঁর
উদ্যোগেই নাকি দুটো শৌচালয় তৈরী হয়েছে। দেবুদা দেখি আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। লোকাল ট্রেনে এরকম অদ্ভূত লোকজন প্রায়ই দেখা যায়। মাঝে মাঝে মজা লাগে আবার অনেক সময় খুব বিরক্তও।
সোদপুর আসতে কিংশুকদা নেমে গেল। আমাদের দলে কিংশুকদাই সব থেকে কম কথা বলে। কোনো কিছুতেই কিংশুকদার ভ্রূক্ষেপ নেই। এতক্ষণ আমার পাশে বসে এই অদ্ভূত ভদ্রলোকের কথা
কিংশুকদাও শুনছিল ভাবলেশহীন মুখ নিয়ে। ভদ্রলোক চালিয়ে যেতে লাগলেন। আমাদের দলের
বাকিরা নিজেদের মধ্যে পুজোর প্ল্যান নিয়ে কথা বলছে। কারুর এদিকে খেয়াল নেই। ভদ্রলোক বলে চললেন:
“সব কিছু যদি আমরা মুখ বুজে সহ্য করি তাহলে কি
করে হবে? রাজ্যের হাল
তো দেখছেন। স্বৈরাচার
চলছে। কারুর ক্ষমতা
আছে জ্যোতিবাবুর বিরুদ্ধে কথা বলার? রেলের অবস্থার
দিনে দিনে অবনতি হচ্ছে। যেরকম কেন্দ্র
সেরকমই রাজ্য। মমতা যাও বা
একটু চেষ্টা করছিল। নীতিশ এসে তো
আবার বারোটা বাজালো! রেলটা অবহেলা করার জিনিস? গোটা ভারতবর্ষকে ধরে রেখেছে এই রেল। আন্দোলনের পথে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় আছে, আপনি বলুন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কি কোনো সংগঠনের সাথে যুক্ত?” ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আমার পক্ষে কোনো কিছুর সাথে যুক্ত
হওয়া আর সম্ভব নয়।” আমি আর এর
কারণ জিজ্ঞেস করে কথা বাড়াতে চাইলাম না।
আমার একটা বদ অভ্যাস হলো, কেউ যদি কিছু বলতে
থাকে আর সেটা যদি প্রচন্ড ক্লান্তিকর বা বিরক্তিকরও হয়, তাহলেও আমি মুখের ওপর কিছু
বলতে পারা তো দুরের কথা, আমার যে সেটা মোটেও ভালো লাগছে না – তাও প্রকাশ করতে পারি
না। তাই জন্য
অনিচ্ছা সত্তেও অনেকের কথা মুখ বুজে শুনতে হয় আর এমন ভাব করতে হয় যে আমি মন দিয়ে
শুনছি বা উৎসাহ পাচ্ছি। ভালো শ্রোতা হওয়ার বিরম্বনা: সব সময় সবার কথা শুনেই যেতে হয়
ইচ্ছে না থাকলেও।
বেলঘরিয়া আসতে শর্মিলা নেমে গেল। ওর নতুন বিয়ে
হয়েছে। বেল্ঘরিয়ায় শশুরবাড়ি। বাপের বাড়ি ব্যারাকপুর। নেমে যাওয়ার আগে
আমাকে বলল, “শুভ, কাল দা ভিঞ্চি কোডটা আনতে ভুলিস না।” আমি তার উত্তরে বললাম নিশ্চই নিয়ে আসবো আর সেটা বলে, ওই ভদ্রলোকের বাক্যবাণ
থেকে বাঁচার জন্য, দেবুদার সাথে নতুন করে
আড্ডা জোড়ার চেষ্টা করলাম: “দেবুদা, তুমি দা ভিঞ্চি
কোড পড়েছ?” দেবুদা কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই ভদ্রলোক
কিছুটা রাগত স্বরে বললেন, “আপনি কথা
ঘোরানোর চেষ্টা করছেন, বুঝতে পারছি, কিন্তু মনে রাখবেন, সমস্যা কিন্তু আপনারও একদিন হতে পারে, যেরকম আমার হয়েছে।”
“না না, শুনছি। বলুন।”
সারাটা রাস্তা তিনি ইংরিজিতে যাকে বলে rant করে গেলেন আর
কোথায় কিভাবে নালিশ জানাতে হয়, কোন দপ্তরে চিঠি
দিতে হয়, সেসব বিস্তারে বলে গেলেন। আমার কলিগরা একে
একে সবাই নেমে গেল। দেবুদা নামল দমদমে। নামার সময় হেসে বলল,
“সাবধানে বাড়ি ফিরিস, শুভ।” তারপর বাকি রাস্তা – অর্থাৎ
দমদম-বিধাননগর-শিয়ালদা – ট্রেনের লেট করা, জীবনে সময়ের দাম, ইত্যাদি বিষয় নিয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ভদ্রলোকের
জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার কথা শুনতে শুনতে এলাম। ট্রেন স্টেশনে থামবে থামবে করছে, আর আমি তাড়াতাড়ি নেমেই ভিড়ে মধ্যে অদৃশ্য
হওয়ার উপক্রম করছি, এমন সময় ভদ্রলোক বললেন, “চলুন, আজ আপনাকে স্টেশন মাস্টারের ঘরে
নিয়ে যাই। ওখানে কোথায় খাতা রাখা আছে দেখে নেবেন। আর নালিশ লেখার কায়দাটাও বুঝিয়ে দেব।” আমি আঁতকে উঠে বললাম,
“না না! আজ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আজ ইয়ে , মানে, ডাক্তারের সাথে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট
আছে। অন্য আরেকদিন না হয়...” ভদ্রলোক বললেন, ডাক্তারের কাছে
তো আমাকেও যেতে হবে। নীলরতনে। চলুন, আপনাকে
দেখিয়ে দি। বেশিক্ষণ লাগবে না।” আমি এটাসেটা
বলে অনেক কষ্টে তাঁর হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে সোজা বৌবাজারের বাস ধরে হাঁফ ছেড়ে
বাঁচলাম। আমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে এতটা ভদ্রতা দেখাত
না। দুটো খারাপ কথা শুনিয়ে দিত লোকটিকে। হয় তো ওনার এরকম অভিজ্ঞতা অনেকই হয়েছে।
যাই হোক, বাড়ি ফিরে ঘটনাটা বাবাকে
বলাতে, বাবা প্রথমে হাসলো, তারপর বলল, কত ধরনের সমস্যার মধ্যে মানুষ পড়ে: যাদের আমরা
পাগল বলি, হয়তো তারা জীবনে কোনো কঠিন ঘা খেয়ে মানসিক
স্থিতি হারিয়েছে। সবার প্রতিই সহনশীল এবং সংবেদনশীল হওয়া উচিত। বাবা বোঝে না যে ডেইলি
প্যাসেঞ্জারীর প্রথম দিকে এরকম সহানুভূতি জাগলেও, দীর্ঘদিন
যাতায়াত করা লোকজনের পক্ষে এরকম ঘটনায় বিরক্তি ছাড়া আর কিছুই আসবে না। মেট্রোয় যারা আত্মহত্যা করেন তাঁদের প্রতি নিত্য-অফিসযাত্রীরা রাগ উগরে দেন অফিস যেতে দেরী
হওয়ার জন্য, মায়া মমতা বিন্দুমাত্র
দেখান না।
তারপরে আমি আর কোনদিন লোকটাকে দেখিও নি। কিন্তু গত বছর, অর্থাৎ ২০১৯-এ, দীর্ঘ ১৬ বছর পর আবার ওনার প্রসঙ্গ কিভাবে উঠলো, এবার সেই
কথায় আসি। ইতিমধ্যে আমি কলকাতার দিকে ট্রান্সফার নিয়ে চলে এসেছি। এখন আমি পড়াই মিত্র
ইনস্টিটিউশনে – বাড়ি থেকে হাঁটা পথ। গত বছর আমার একমাত্র ভাগ্নী সুনয়নার সাথে বিয়ে ঠিক হয় জগদ্দল-নিবাসী অশোকের। ছেলেটির
স্বভাব-চরিত্র বেশ ভালো, কলকাতায় কর্পোরেশনে অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার। কলকাতার দিকে বাড়ি
নেওয়ার চেষ্টা করছে, দেখতে শুনতেও বেশ ভালো। বৌভাতের অনুষ্ঠান ঠিক হয় ১৫ ডিসেম্বর জগদ্দলের আশির্বাদ ভবনে। আমি জগদ্দলের ওপর
দিয়ে ট্রেনে করে গেলেও, কোনদিন সেখানে নামিনি। অনুষ্ঠানের দিন এই
বিষয়েই কথা হচ্ছিল অশোকের জ্যাঠামশাইয়ের সাথে। খুবই মাই-ডিয়ার লোক ভদ্রলোক। জগদ্দলের নারিনক্ষত্র
সব জানেন। দেখলাম বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে উনি বেশ উদ্বিগ্ন। রাজনৈতিক দলগুলোর
মধ্যে কোন্দল এবং অরাজকতার জন্য কোনো ধরনের উন্নয়ন হচ্ছে না এই অঞ্চলে।
“আপনারা যে রাস্তাটা ধরে এলেন, অবস্থাটা দেখেছেন নিশ্চই?”
“হ্যাঁ, আলো একটু কম ছিল।”
“বছর তিনেক আগেও এরকম
ছিল না জানেন? সব ওই নতুন নেতা ফাল্গুনী বাগ আসার পর থেকে শুরু হয়েছে অবনতি।”
আমার কেন জানিনা হঠাৎ করে অতদিন আগেকার সেই লোকটির কথা মনে পড়ে গেল। আমি ঘটনাটা তাঁকে বলাতে তিনি বললেন, “ও, শ্যামলবাবু?
উনি তো বিখ্যাত লোক মশাই!”
“বিখ্যাত?”
“হ্যাঁ, এ অঞ্চলে অনেক কাজ করেছিলেন। তবে...বেশ কষ্টের জীবন।”
“বলছি যে, আপনার এখন এখানে কোনো কাজ আছে?”
“মানে, বিয়েবাড়িতে?”
“হ্যাঁ।”
“তা আছে বৈকি। লোকজনকে অ্যাটেন্ড করতে হবে না?”
“চলুন না বাইরে একটু
হাওয়া খেয়ে আসা যাক।”
এই বলে আমি তাঁকে একটা
সিগারেট অফার করলাম। তিনি সেটা গ্রহণ করে, মৃদু হেসে বললেন, “কি ব্যাপার বলুন তো?”
“চলুন, বলছি।”
বাইরে এসে আমি ওনার
কাছে ২০০৩ সালের সেই রহস্যময় ভদ্রলোকের ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চাইলাম। উনি যা বললেন, তা সংক্ষেপে অনেকটা এরকম:
শ্যামল চট্টরাজ একসময়
জগদ্দল পোস্ট অফিসে পোস্টমাস্টারের চাকরি করতেন। ছাত্রবস্থায় নকশাল আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। ছোটবয়স থেকেই আদর্শবাদী, একরোখা আর প্রতিবাদী মনোভাবের
অধিকারী হওয়ার জন্য অনেক সময় যেরকম প্রশংসা পেয়েছেন, সেরকমই ঝামেলায়ও জড়িয়েছেন অযথা। জগদ্দল নিয়ে তাঁর গর্বের শেষ ছিল না। এমন কোনো সমাজসেবামূলক কাজ ছিল না যার সাথে শ্যামলবাবু জড়িত ছিলেন না। বাচ্চাদের জন্য একটা পার্ক করা ছিল জীবনের একমাত্র স্বপ্ন। নিজে বিয়ে থা করেন নি, কিন্তু অনেক গরিবের মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন নিজে দাঁড়িয়ে
থেকে। রুলিং পার্টি, অপজিশন সবাই সমীহ করত ওনাকে। জগদ্দল স্টেশনের উন্নতির সার্থে রেলের কর্মীদের নিয়ে নিজের উদ্যোগে আন্দোলন
শুরু করেন এবং বিস্তর পরিশ্রম করে, এখানে ওখানে ছোটাছুটি করে, চিঠিচাপাঠি করে স্টেশনের শেড লাগানো, টয়লেটের ব্যবস্থা ও প্লাটফর্ম চওড়া করা, ইত্যাদির ব্যবস্থা করেন। আজকের দিনে ভাবাই যায় না যে একজন লোক একার চেষ্টায় এত কাজ করে থাকতে পারেন –
বিশেষ করে একটা স্টেশনের উন্নতির জন্য। বিভিন্ন মহলে চেনাশোনা থাকার জন্য
সুবিধে হয়েছিল, এ কথা অবশ্য অনস্বীকার্য। কিছু অদ্ভূত চারিত্রিক দিক ছিল
যেগুলোর ব্যাপারে সকলেই জানতো। যেরকম ওনার
মারাত্ত্বক রকমের সময়ানুবর্তিতা। কিন্তু নিজে কখনো ঘড়ি পরতেন না। শোনা যায়, অফিসের পর যখন বাড়ি ফিরতেন, ওনাকে দেখে লোকে ঘড়ি মিলিয়ে নিত। নিজে পান্কচুয়াল ছিলেন, আর অন্যদের মধ্যেও তা দেখতে চাইতেন।
শ্যামলবাবু থাকতেন
স্টেশনের কাছেই, দোতলা পৈত্রিক বাড়িতে। তিনকূলে কেউ ছিল না, একটি ভাইপো ছাড়া, যাকে তিনি নিজের সন্তানের মত করে মানুষ
করেছিলেন। দাদা-বৌদি অপঘাতে মারা গিয়েছিলেন নব্বইয়ের দশকের
গোড়ার দিকে, অমরনাথে তীর্থ করতে গিয়ে জম্মু শ্রীনগর ন্যাশনাল হাইওয়ের ওপর একটা
এক্সিডেন্ট-এ। কাগজের প্রথম পাতায় বেরিয়েছিল সে
খবর। ভাইপোটি মেধাবী ছিল। জগদ্দল টাউন ইস্কুল থেকে ফার্স্ট ডিভিসনে পাশ করার পড়ে কলকাতায় সিটি কলেজে
অঙ্ক নিয়ে ভর্তি হয়েছিল। রাজনীতি করে
নিজের ছাত্রজীবনের অনেকটা সময় ‘নষ্ট’’ করেছিলেন
শ্যামলবাবু, তাই তিনি
ভাইপোর ওপর কড়া নজর রাখতেন সে ইউনিয়ন করছে কিনা বা পার্টির দাদাদের সাথে সময়
কাটাচ্ছে কিনা। অনেক স্বপ্ন
ছিল তাঁর ভাইপোকে নিয়ে: জীবনে নিজের পায়ে দাঁড়াবে, বড় চাকরি করবে, কিন্তু সব থেকে
আগে মানুষের মত মানুষ হবে। আর সেই স্বপ্ন সফলও হচ্ছিল ধীরে ধীরে। ছেলেটি খুবই পরোপকারী, সদাহাস্যময় আর
সর্বজনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। কলেজের শিক্ষকরা
তো স্নেহ করতেনই, সহপাঠীদের মধ্যেও সে তার সুমিষ্ট ব্যবহার এবং পরপকারিতার জন্য
সকলের ভালবাসা পেত। গর্বে
শ্যামলবাবুর বুক ফুলে উঠত। ভেবেছিলেন সময়
আসলে ভাইপোকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে দেবেন
তাঁর স্থাবর-অস্থাবর
সম্পত্তি কোথায় কি আছে। তিনি নিজে
অনেক কষ্ট করেছেন, কিন্তু ভাইপো
যাতে পড়াশোনায় আর কাজে মন দিতে পারে সেই ব্যবস্থা করে যাবেন। সময় হলে একটি ভালো মেয়ে দেখে ভাইপোর বিয়ে দেবেন। তিনি নিজে সারাজীবন একা থেকে ভুল করেছেন, এ কথা তিনি অনেক পড়ে এসে বুঝেছেন। একা কেউ থাকতে পারে না, সবার একজন সঙ্গী দরকার। মাঝবয়সে এসে তার অনেক উপলব্ধিই হয়েছিল আর মাঝে
মাঝে সেগুলো তাঁর বোঝার মতন মনে হতো - মাঝবয়স থেকে বার্ধক্যের মধ্যে সেতুর মত
দাঁড়িয়ে থাকে যেসব উপলব্ধি বা বোধ।
একদিন বিকেলে তাঁর সমস্ত উপলব্ধি, বোধ ও স্বপ্ন ছারখার হয়ে যায়। তিনি পোস্ট অফিস থেকে বেরিয়েছেন সবে, অমনি পোস্টম্যান শিবু ছুটতে ছুটতে এসে বলে যে তাঁর ফোন আছে। এন আর এস হাসপাতাল থেকে ফোন। ভাইপো পথ-দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত। শ্যামলবাবু সঙ্গে সঙ্গে একটা রিক্সা ধরে
স্টেশনে গেলেন এবং ট্রেনের জন্য উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। শিয়ালদা যাওয়ার ট্রেন প্রায় কুড়ি মিনিট বাদে। অস্থির হয়ে প্ল্যাটফর্মে পায়চারী করার পর ট্রেন
এলো। কিন্তু সেদিন
লাইনে কোনো সমস্যার কারণে প্রত্যেক স্টেশনেই ট্রেন প্রায় দশ-পনেরো মিনিট করে
দাঁড়াচ্ছিল। শ্যামলবাবুর
অস্থিরতা প্রায় পাগলামির পর্যায় চলে যায় এবং গাড়ি যখন দমদম ঢুকছে তখন তিনি রীতিমত
পাগলের প্রলাপ বকতে শুরু করেছেন। তাঁর
সহযাত্রীরা তাঁকে শান্ত করতে চেষ্টা করলেও সক্ষম হন নি। অবশেষে বিধাননগর স্টেশনে ঢোকার মুখেও যখন গাড়ি প্রায় কুড়ি
মিনিট দাঁড়িয়ে রইলো, শ্যামলবাবু আর
থাকতে না পেরে ট্রেন থেকে ঝাঁপ দিয়ে নামেন। তখনো স্টেশনে ট্রেন ঢোকেনি। রেললাইনের ওপর পড়তেই তাঁর গোড়ালি মুচকে গেল। পেছন থেকে গেল-গেল রব উঠলো।
ল্যাংড়াতে ল্যাংড়াতে ট্রেনলাইনের পাশ দিয়ে দৌড়তে
লাগলেন স্টেশনের উদ্দেশ্যে। অবশেষে
বিধাননগর স্টেশনে এসে সেখান থেকে বাস ধরে এন আর এসে এসে সোজা ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডে
গিয়ে দেখেন...
সব শেষ।
বাপ-মা আর ছেলে এখন আবার একসাথে। একই পরিনতি তাদের তিনজনেরই। দুর্ঘটনা।
মাঝে মাঝে শ্যামলবাবু ভাবতেন জীবনটাই একটা
দুর্ঘটনা। এই যে আমরা এই
পৃথিবীতে এসেছি একেকজন একেক অবস্থায়, পরিস্থিতিতে – এটা এক ধরনের accident ছাড়া আর কি!
এর পর শ্যামলবাবু বেঁচেছিলেন আর এক বছর। আর ভাইপোকে হারানোর দুঃখ ও একাকিত্ত্ব তাঁকে
অবসাদের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। শেষের দিকে
তিনি খাওয়া-দাওয়া ঠিক করে করতেন না। চাকর একজন ছিল, তাকেও বিদায় করেছিলেন। ডায়াবিটিস ছিল, কিন্তু অসুধ
খেতেন না ঠিক করে। একদিন সকালে
বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে শ্যামলবাবুর বন্ধু কাশীনাথ রায় দেখতে পান শ্যামলবাবু
বাড়ির উঠোনে মাথা নিচু করে, পা দুটো মুড়ে, ঘাড় গুঁজে বসে আছেন। দেখে কাশিনাথের অস্বাভাবিক লাগে। সে শ্যামলবাবুর কাছে এসে দেখেন গা হাত পা শক্ত
হয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে
রঘু-ডাক্তারকে ডেকে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন, এবং ডাক্তার এলে শ্যামলবাবু কে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। সালটা ছিল ২০০৩, অর্থাৎ যে বছর তাঁকে আমরা ট্রেনে দেখি।
অশোকের জ্যাঠামশাই যখন জিজ্ঞেস করলেন যে কেন আমি
শ্যামলবাবুর সম্পর্কে জানতে চাইছি, তখন আমি সেইদিনের ঘটনাটার কথা বললাম। তিনি একটুও অবাক হলেন না। বললেন, “শেষের দিকে
শ্যামলবাবুর মানসিক বিকার দেখা দিয়েছিল। ট্রেনে উঠে লোকজনকে ট্রেন লেট করা নিয়ে জ্ঞান দিতেন। কয়েকবার তো শুনেছি পাগল ভেবে লোকজন ট্রেন থেকে নামিয়েও
দিয়েছিল। খুব দুঃখের
ব্যাপার জানেন...এরকম একটা ভালো, সৎ মানুষের এমন পরিনতি... পাড়া প্রতিবেশীরা সবাই
মিলে ওনার চিকিৎসা করানোর কথা
বলেছিল। কিন্তি উনি
কিছুতেই রাজি হননি। মৃত্যুর পড়ে
স্টেশনের পাশে ওনার স্মৃতিতে একটা আবক্ষ
মূর্তি বসানো হয়। এরকম একজন
মানুষ আজকালকার দিনে ভাবাই যায় না। এই অঞ্চলে
পুরনো লোকেরা এখনও বলেন।”
এসব শুনে আমি ঠিক করলাম ওনার মূর্তিটা দেখে তবে
বাড়ি ফিরবো।
অনুষ্ঠানপর্ব শেষ হলে আমাদের বেরোতে বেরোতে
প্রায় রাত সারে-এগারোটা হলো। গাড়ির
ব্যবস্থা ছিলোই। বড় একটা গাড়ি
ভাড়া নিয়েছিলাম। আমি আমার
স্ত্রী-কন্যা আর আমার ছোট ভাই ও তার স্ত্রী এবং পুত্র। ড্রাইভারকে বললাম, একবার স্টেশন হয়ে চল। ড্রাইভার অবাক হয়ে বলল, “ওদিক দিয়ে তো রাস্তা নেই, দাদা।” আমি বললাম, “স্টেশনে
মিনিট পাঁচেকের একটা কাজ আছে।” আমার স্ত্রী
আর ভাই বলল, “এত রাতে আবার
কি কাজ?” “পড়ে বলছি”,
আমি বললাম। স্টেশনের পাশে
ঠিক কোন জায়গাটায় মূর্তিটা রয়েছে সেটা আগেই জেনে নিয়েছিলাম অশোকের জ্যাঠামশাইয়ের
কাছে, তাই খুঁজে পেতে অসুবিধে হলো না। আগাছায় ঢাকা ছোট একটা আবক্ষ মূর্তি – একেবারেই পরিষ্কার-টরিষ্কার হয় না দেখেই
বোঝা যাচ্ছে। ওপরে একটা শেড
করে দেওয়া হয়েছে বটে কিন্তু সেটারও একটা দিক ভেঙে গেছে। মোবাইলের টর্চ জ্বেলে মূর্তিটা ভালোভাবে দেখলাম। স্বস্তার মূর্তি। শ্যামলবাবুর মুখ স্বাভাবিক কারণেই মনে নেই, কিন্তু কেন
জানি মনে হল আসল মুখের সাথে এই মূর্তির সাদৃশ্য তেমন নেই। হয় তো কম খরচে কোনো অপটু কারিগরকে দিয়ে বানানো বলে। তলায় নাম, তাঁর স্মৃতির
উদ্দেশে কিছু কথা, জন্মস্থান, জন্মের বছর এবং মৃত্যুর তারিখ দেওয়া আছে – ২৮শে
মার্চ ২০০৩। আমি দাঁড়িয়ে
রইলাম কিছুক্ষণ মূর্তিটার সামনে। শ্যামল
চট্টরাজ। যার সাথে আমার
শুধু একবার দেখা হয়েছিল। ট্রেনে বাসে
এরকম কত লোকের সাথে দেখা হয়। কেউ অদ্ভূত
কিছু করলে মনে থেকে যায়। প্রত্যেকের
ইতিহাস খুঁজলে এরকম কত গল্প হয়ে যায়। ভূত-ভবিষ্যত
না জেনেও গল্প তৈরী করা যায়। প্রত্যেক
গল্পের জন্মই বাস্তবে। কিন্তু গল্পটা
যখন শেষ হয় তখন বাস্তব আর কল্পনা মিশে এমন একটা জিনিস তৈরী হয় যে তার মধ্যে কোনটা
কতখানি রয়েছে সেটা আর বলা যায় না। অনেক সময়
গল্পের নাট্যরূপ এমন জমজমাট আকার ধারণ করে যে গল্পকারের নিজেরই মনে থাকে না যে
আসলে ঘটনা ঠিক কি ঘটেছিল।
মোবাইলে মূর্তিটার একটা ছবি তুলে, গাড়িতে উঠে সবাইকে পুরো ব্যাপারটা বলতে সবাই বেশ মজাই পেল। অনেকটা গল্পের মতন করেই বললাম: “সালটা বোধ হয় ২০০৩। আমি সদ্য বি এড পাশ করে স্কুল সার্ভিস কমিশন-এ ইন্টারভিউ
দিয়ে কল্যানীতে একটি স্কুলে চাকরি পেয়েছি...” গাড়ি তখন প্রায় বৌবাজার ঢুকে গেছে, এমন সময় একটা খটকা লাগলো।
শ্যামল চট্টরাজের মৃত্যুর দিনটা কি ঠিক দেখলাম? ২৮.০৩.২০০৩? হতেই পারে না, কারণ আমি স্কুলে জয়েন করেছিলাম ২০০৩ সালের জুলাই মাসের ১৬
তারিখ। প্রথম চাকরিতে
জয়েন করার তারিখ সকলেরই মনে থাকে। মোবাইলে তোলা
ছবিটা দেখতে গিয়ে দেখি চার্জ ফুরিয়ে গেছে। বাড়িতে ঢুকে প্রথমেই ফোন চার্জে বসলাম, তারপর ফ্রেশ হয়ে নিয়ে, মোবাইল খুলে
দেখলাম মূর্তির তলার দিকে যে তারিখটা খোদাই করা আছে সেটা বাস্তবিকই ২৮শে মার্চ
২০০৩, মানে আমার চাকরিতে যোগদান করার প্রায় চার মাস আগে। ফ্ল্যাশ অন করে ছবিটা তুলেছিলাম, তাই স্পস্ট বোঝা যাচ্ছে। ভালো করে একবার দেখলাম জুম্ করে। সতেরো বছরের পুরনো মূর্তি – হয়ত দাগ পড়ে ৯টা ৩ এর মতন হয়ে
গেছে। এটাও হতে পারে
খোদাই করার সময় কারিগর ভুল করেছে। সস্তায় করালে
যা হয় আর কি। আমি কল্পনা
করলাম: একটা স্মৃতিসভা হচ্ছে শ্যামলবাবুর। সেখানে তাঁর আবক্ষ মূর্তি উন্মোচন হবে। কেউ একজন আবিষ্কার করেছে যে ডেটটা ভুল আছে। সমিতির কোনো হর্তাকর্তার কানে ব্যাপারটা আসতে প্রথমে তিনি
তো ভয়ানক রেগে গেলেন। তারপর রাগ
কমলে বললেন, ওই তারিখের
জায়গায় যেন সুন্দর করে ঠিক তারিখটা হাতে লিখে দেওয়া হয় – অনুষ্ঠান শেষ হলে সেই
কারিগরকে ডেকে ওটা ঠিক করানো হবে। হয়ত
অনুষ্ঠানের পর ব্যাপারটা লোকজন বেমালুম ভুলেই গেছিল বা ইচ্ছে করেই আর ঠিক করেনি।
যাই হোক, কাল পুরনো স্কুলের কলিগদের WhatsApp গ্রুপে ঘটনাটা
লিখব। অবশ্য ঘটনাটা
ওদের মনে আছে কিনা কে জানে! মূর্তিটার কথা ভাবতে ভাবতে ঘুম এসে গেল। দি লেট শ্যামল চট্টরাজ। তাঁর প্রিয় জগদ্দল স্টেশনের লাগোয়া একটা জায়গায় বসে
ট্রেনেদের আসা যাওয়া দেখে যাবেন সারাজীবন।
........................................................................................................................
রাতের জগদ্দল স্টেশনে প্ল্যাটফর্মগুলোর সব কটা আলো
ঠিক মত জ্বলে না। রাতে, বিশেষ করে শীতকালের রাতে, এমন একধরনের নিস্তব্ধতা থাকে যা
প্রায় কানে লাগে। এক নম্বরে
একটা পাগল শুয়ে থাকে গুটিসুটি মেরে। চার নম্বর
প্ল্যাটফর্মের পাশে কয়েকটা ছাতিম গাছ আছে। অন্ধকারে দেখা যায় না ঠিক, কিন্তু নিশ্চই
আছে। শীতকালের সাথে
ছাতিম সন্ধি ক’রে রাতের অন্ধকারে। বাতাসে বাতাসে
যেন একটা দেরী হওয়া ভাব ভেসে বেড়ায় সারা রাত – ভোর হলে যা চুরি করে নেয় মানুষের
আনাগোনা।
“কিরে হাবুল! এলি?”
“হ্যাঁ, ছোটকা।”
“আজ এত দেরী হলো যে?”
“ট্রেন লেট ছিল।”
“আমার খুব চিন্তা হয়ে গিয়েছিল রে হাবলা! তুই
ছাড়া আমার যে আর কেউ নেই রে বাপধন!”
“আজকাল খুব লেট হচ্ছে ট্রেন।”
“বরাবরই হত রে, বরাবরই হত।”
২২শে জুলাই '২০
Outstanding! Tomar ei gawlper muul ghawtona ta tumi amake aagey ekdin bolechhile. Kintu ghawtonaa aar gawlper modhye je pharak tuku thake, sheta amar kachhe Puri bishoy ta kei notun kore tule dhorlo!
ReplyDeleteThank you, Arnab da.
Deleteবেশ ভালো । এই রকম একটা চরিত্রের কথা কোথায় যেন পড়েছিলাম । খুব সুন্দর হয়েছে চালিয়ে যাও
ReplyDeleteDarun laglo. Specially ei somoe nie khutkhutemi r beparta amar nijer o ache. Jonoiko bondhu ra tai amae kokhono kokhono Mr. OCD bole dake. Janina sesh porjonto ei porinoti hobe kina amaro.
ReplyDeleteDarun hoye6e. Kub soundor erokom aro golpo chy 😍
ReplyDelete