বাড়িতে কেউ নেই
গভীর রাত। ফোনের রিং। মেলবোর্নের মফস্বল পয়েন্ট কুকে তখন রাত একটা। আধো ঘুমের মধ্যে…
— হ্যালো… কে?
— হ… হ্যালো… তি… তিন্নি? তুই?
— বাবা? এই সময়? এখানে
তো রাত বারোটা! কী হয়েছে?
— আ… আমি… আমি ঠিক আছি রে… তুই… ঘুমোচ্ছিলি?
— Obviously ঘুমোচ্ছিলাম! এত রাতে ফোন করছ কেন? কী হয়েছে?
— ও… ওখানে… রাত? আমি ভেবেছিলাম… সকাল… এখানে
তো… রাত আটটা হলো…
— বাবা, টাইম ডিফারেন্স আছে তো। বলো, কী দরকার?
— না… তেমন কিছু না… তোর সাথে… একটু কথা বলব ভেবেছিলাম…
— হুম… বলো।
— আজ… আজকে তোর পিসি এলো… আমার কাছে… বলল… তুই নাকি… ফোন করিস না…
— কোন পিসি?
— ওই… রেণু পিসি…
— বাবা, রেণু পিসি তো অনেক বছর আগে মারা গেছে।
তুমি কী বলছো? ওষুধগুলো ঠিকমতো খাচ্ছো তো?
— হ্যাঁ… খাচ্ছি তো… খাচ্ছি… মাঝে মাঝে… ভুলে যাই…
— “মাঝে মাঝে” মানে? আমি তো বলেছি টাইমে খেতে!
কেয়ারটেকার আসে তো?
— হ্যাঁ… আসে… সব করে দেয় … তুই কেমন আছিস?
— আমি ঠিক আছি। কিন্তু এখন কথা বলার টাইম না, বাবা।
— তোর… ওই… নামটা কী… জামাই… রাহুল?
— বাবা! রাহুল নয়—রোহিত।
— হ্যাঁ… হ্যাঁ… রোহিত… সে ভালো তো?
— হ্যাঁ, ভালো আছে।
— আর… বাচ্চাটা… আমার নাতনি… কেমন আছে?
— ভালো আছে। ঘুমোচ্ছে এখন।
— আমি… আমি কি… একবার… দেখতে পারি? ভিডিওতে?
— বাবা, প্লিজ! এখন রাত একটা! সবাই ঘুমাচ্ছে।
—একা লাগছিল… তাই…
— আচ্ছা, কাল কথা বলব। এখন আমি সত্যিই পারছি
না।
— আ… আচ্ছা… ঠিক আছে… তুই ঘুমো… আমি… ভালো আছি…
— ওষুধগুলো ঠিকমতো খেয়ো, প্লিজ। আর আমি কাল
ওই কেয়ারটেকারের সাথে কথা বলব।
— হ্যাঁ… হ্যাঁ… ঠিক আছে…
— ঠিক আছে, রাখছি। গুড নাইট।
— গুডনাইট, মা… ফোন করিস…
কল কেটে গেছে। ঘর অন্ধকার। পাশে শুয়ে থাকা রোহিত কাত হয়ে উঠে বসে। মাঝখানে ছোট্ট কুহু র অবশ্য ঘুম ভাঙেনি।
— বাবা এত রাতে কী বলছে?
— কী আবার বলবে? আবার টাইমটা গুলিয়ে ফেলেছে।
— উফ্… কী বলছিল?
— উল্টোপাল্টা… বলছে আজকে নাকি রেণু পিসি এসেছিল বাড়িতে! বোঝো
কাণ্ড! রেণু পিসি তো কবেই…
— এটা তো রেগুলার হয়ে যাচ্ছে এখন। তুমি কিছু একটা অ্যারেঞ্জ করছ না
কেন?
— করেছি তো! কেয়ারটেকার আছে, ওষুধ আছে… আর কী
করব বলো?
— ঘুমটা একেবারে নষ্ট হয়ে গেল। কাল আমার সকাল সকাল মিটিং আছে।
— আমারও আছে…
— তুমি সাইলেন্ট করে রাখতে পারো না ফোনটা রাতে?
— পারি… কিন্তু যদি সত্যি কিছু হয়? যদি জরুরি
কিছু লাগে?
— হ্যাঁ, সেটাও ঠিক… কিন্তু এভাবে তো রোজ রোজ
চলতে পারে না।
— আমি জানি… কিন্তু বাবা তো আর ইচ্ছে করে করছে না…
— কাল আয়াদের বলে দেবে, বাবা যেন রাতে ফোন না
করে।
— হুম… খারাপও লাগে! কিন্তু কী করা যাবে!
তর্ণিষ্ঠা চুপ করে থাকে। জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকে। বাইরে হালকা হাওয়া দিচ্ছে। গাছগুলো সব দুলছে।
— এখন আর ঘুম আসবে না…
— চেষ্টা করো… কাল খুব টাফ ডে।
— হ্যাঁ, পর পর দুটো মিটিং ক্লায়েন্টদের
সাথে। ঘুমটা দরকার ছিল।
— বাবার গলাটা… মাথায় ঘুরছে…
— তুমি একবার সুমনের সাথে কথা বলো না।
— হ্যাঁ, তাই বলব। দেখি, আমি ওকে কাল ফোন করব।
দুজনেই চুপচাপ শুয়ে থাকে। ঘুম আর আসে না সহজে।
দিনের বেলা, লস অ্যাঞ্জেলেস। ব্যস্ত
ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিং ফার্মের ফ্লোর। ফোন ভাইব্রেট করে।
“Baba calling…”
— হ্যালো… বাবা?
— হ… হ্যালো… সুমন? তুই… অফিসে?
— হ্যাঁ বাবা, I’m at work. Busy আছি। কী হলো?
— পাশ থেকে কেউ বলে ওঠে: “Hey Suman, did you send the
deck?”
— Yeah, just a sec, I’m on a call.
— আ… আমি… ভাবছিলাম… তুই… খেয়েছিস?
— বাবা, এখানে এখনও লাঞ্চ হয়নি। It’s
morning.
— ও… ওখানে… সকাল? আচ্ছা… আচ্ছা…
— [কিছুক্ষণ নীরবতা, শুধু অফিসের শব্দ]
— বাবা, বলো… কিছু দরকার?
— … না… তেমন না… আজ… আজকে তোর… দাদা এলো…
— কোন দাদা?
— ওই… তোর বড় দাদা… সে বলল… তুই… বাড়ি আসিস না…
— বাবা… আমার কোনো “বড় দাদা” নেই যে আসবে। কী বলছো তুমি? ওষুধ খেয়েছো?
অন্য দিক থেকে— Suman, client’s on the line!
সুমন চাপা গলায় উত্তর দেয়— Give me two minutes!
— বাবা, প্লিজ বলো—ওষুধগুলো খেয়েছো?
— হ্যাঁ… হ্যাঁ… খেয়েছি… মাঝে মাঝে… ভুল হয়ে যায়…
— That’s not okay, বাবা. Regular খেতে হবে।
— হ্যাঁ… হ্যাঁ… জয় … সুকান্ত… ওরা আসে…
— Good. ও থাকে তো?
— হ্যাঁ… হ্যাঁ… তুই… কেমন আছিস?
— I’m fine, বাবা, but I’m really busy.
— তোর… ওই… বৌমা… কী নাম… কেতকী?
— It’s not Ketaki. ওর নাম Riya। আর আমাদের এখনও বিয়ে হয়নি।
— হ্যাঁ… রিয়া… সে ভালো?
— Yes, ভালো আছে।
অন্য দিক থেকে কেউ জোরে বলে ওঠে— We need you in the
meeting room, NOW.
সুমন চাপা গলায়, বিরক্ত হয়ে উত্তর দেয়—
Coming!
সুমন ফোনটা পাশে সরিয়ে রাখে। ওদিকে বৃদ্ধ কণ্ঠস্বর বলে
চলে, এই ভেবে যে ছেলে শুনছে। আর অন্যদিকে সুমন তার কলিগের
সাথে কথা বলে চলে। বাবা আর ছেলের আলাদা আলাদা কথা মিলেমিশে যায়। বিচিত্র এক
অর্থহীন কোলাজ তৈরি হয় কথার।
|
আমাকে তোর কাছে নিয়ে
চল না কয়েকদিনের জন্য। যাবি তো? এখানে একা একা ভালো লাগে না। তোর মা-ও
আমার সাথে কথা বলে না। টিভি দেখি। আয়াগুলো সিরিয়াল দেখে। আমার ভালো লাগে না
ওসব। আমি বলি, একটু রবীন্দ্রসঙ্গীত চালিয়ে দাও—ওরা
কিছুতেই শুনবে না। তারপর জয় আর সুকান্ত এসে ধমক দিলে তবেই শোনে। নতুন আয়াটা
বদমাশ। মনে হয় জিনিসপত্র চুরি করে। তুই একটু সিসিটিভিতে দেখিস তো। আমার সাথে এরা খুব জোরে জোরে কথা বলে। তুই ওদেরকে একবার বলে দিবি এত জোরে কথা না বলতে। কে আবার এলো এখন! কে
বেল বাজাচ্ছে? বলে দাও তো, কেউ বাড়িতে নেই। কে এল… বলছে… কাগজ…
সই করতে… আমি… আমি পারছি না… হাতটা… কাঁপছে… আচ্ছা বাবু?… শোন, এখন ফোন রাখছি। পরে আবার ফোন করব। কে এল… |
Suman, can you jump on the
client call right now? Yeah, give me a minute… I’m
just wrapping up. Yeah, what’s
the update on the numbers? We need your
approval before sending it to the client. Okay, pull it
up. I’ll take a quick look. Hmm… change
this figure. This doesn’t look right. Got it. Also, the
revenue projections—did you factor in the revised guidance from last quarter? Not fully. I
was waiting on your confirmation. No, include
it. Otherwise, the valuation looks inflated. The client will push back. Makes sense.
I’ll update the model. And this
slide—too cluttered. Simplify it. Highlight just the key drivers. Okay, cleaner
version, three bullets max? Yeah. Keep it
sharp. They don’t have patience for too much detail. Got it.
Anything else? No, send me
the updated deck in ten. We’ll jump on the call together. Perfect. I’ll
turn it around quickly. Thanks.
|
|
বলে দাও না, বাড়িতে কেউ নেই! |
সুমন কলিগের সাথে
আলোচনায় ব্যস্ত। তার খেয়াল নেই ফোনের কথায়। তার বাবা অসংলগ্ন কথা বলে চলে।
কাজের মধ্যে থেকে বাবার সাথে কথা বলা সম্ভব হয় না। এদিকে সে দেখেছে যে তার বাবা
সে তেমন রেসপন্ড না করলেও একতরফা কথোপকথন চালিয়ে যায়, তাই “ফোন রাখছি,
এখন ব্যস্ত, পরে ফোন করব”—এসব বলার পরিবর্তে
সে বাবাকে বলতে দেয়, এই ভেবে যে এতে বাবারও একটু শান্তি
হয়। |
কিছুক্ষণ পরে সে ফোন তুলে “হ্যালো” বলে আর অন্য দিকে শুনতে পায় কলকাতার তার বাড়ির আওয়াজ। “হ্যালো বাবা, শুনতে পাচ্ছো?” কয়েকবার বলার পরেও কোনো উত্তর পায় না। শুধু হালকা নাক ডাকার শব্দ। ফোন কেটে ফোনে সিসিটিভি চেক করে। বাবা ঘুমিয়ে পড়েছে।
চেম্বার। ডাক্তার চক্রবর্তী রিপোর্ট দেখছেন। জয় সামনে বসে আছে, একটু উদ্বিগ্ন।
— হ্যাঁ, বলুন—আপনি জয় তো?
— হ্যাঁ, ডাক্তারবাবু। আমি ওনার
দেখাশোনা করি—এখন পুরো দায়িত্বটাই আমাকেই দিয়েছে ওনার ছেলে-মেয়ে।
— ঠিক আছে। আপনি নিয়মিত থাকেন ওনার সঙ্গে?
— সারাদিনে প্রায় বেশ কিছুক্ষণ থাকি। বাড়িতে কী লাগবে
না লাগবে দেখি। আসলে এই কেয়ারটেকারের চাকরি ছাড়াও পাশাপাশি কিছু কাজ করি। দু’জন
আয়া আছে—তারা ওনাকে দেখে।
— ওনার অবস্থা এখন একটু অ্যাডভান্সড স্টেজে গেছে।
— হ্যাঁ, আমি দেখছি হাত কাঁপে, হাঁটতেও কষ্ট হয়—ওয়াকার
নিয়ে হাঁটে। ধরে ধরে হাঁটাতে হয়…
— হ্যাঁ, এই রোগের এগুলো ক্লাসিক
লক্ষণ—ট্রেমর, বা হাত কাঁপা; রিজিডিটি;
স্লো মুভমেন্ট; ব্যালান্স সমস্যা… তার সঙ্গে
আরেকটা জিনিস আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন—উনি মাঝে মাঝে বাস্তব আর অবাস্তব
গুলিয়ে ফেলেন?
— একদম তাই। অনেক সময় এমন লোকের কথা বলেন যারা নেই,
বা বলেন কেউ এসেছে… দরজা খোলা আছে… এসব। জানলায় চড়ুইপাখি আসে,
তাদের সাথে কথা বলেন।
— এটাকে আমরা বলি altered perception—এই ধরনের সাইকোসিস এই স্টেজে খুব কমন।
— এটা কি খুব খারাপ কিছু?
— ভয় পাওয়ার কিছু নেই, কিন্তু ম্যানেজ করতে
জানতে হবে।
— সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট যেটা—আপনি ওনাকে কখনো সরাসরি ভুল প্রমাণ
করতে যাবেন না।
— মানে?
— মানে, ধরুন উনি বললেন কেউ এসেছে—আপনি বলবেন
না “না, কেউ আসেনি।” এতে উনি অস্থির হয়ে যাবেন। বরং বলবেন,
“আচ্ছা, আমি দেখে আসছি”—তারপর ধীরে ধীরে
প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিন।
— আচ্ছা… মানে শান্ত রাখা।
— একদম।
— ডাক্তার জয়ের আনা
রিপোর্টগুলো অনেকক্ষণ ধরে দেখলেন।
— এমআরআইতে কিছু age-related changes আছে,
কিন্তু বড় কিছু নয়। ডোপামিন লেভেল কমে গেছে। উনি কি ওষুধগুলো
নিয়ম করে খাচ্ছেন?
— আমি খাওয়াই, কিন্তু কখনো কখনো উনি খেতে চান
না।
— ওষুধগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি হ্যালুসিনেশন বাড়ে, হালকা অ্যান্টিসাইকোটিক দিতে হতে পারে। টাইম মিস করা যাবে না।
— আচ্ছা।
— আর কিছু সাবধানতা
অবলম্বন করতে হবে। উনি যেন একা হাঁটাচলা না করেন—ফল রিস্ক বেশি। বাথরুমে
গ্র্যাব-বার লাগান, রাতে হালকা আলো রাখুন, সহজে হজম হয় এমন খাবার দিন।
— ঠিক আছে। এগুলো আমি দেখে নেব।
একটু থেমে
ডাক্তার চশমাটা খুলে হাতে নিলেন, আর জয়ের দিকে তাকিয়ে
জিজ্ঞেস করলেন:
—ওনার ছেলে-মেয়েরা একেবারেই আসেন
না?
— আসে, তবে কম। আগে তাও আসত মাঝে মাঝে। এখন
আসাটা অনেক কমে গেছে।
— I see… ডাক্তার
চক্রবর্তী দীর্ঘশ্বাস ফেলে টেবিলের দিকে তাকিয়ে বললেন।
— আচ্ছা, ডাক্তারবাবু… কাকু মাঝে মাঝে খুব একা একা কথা বলেন… পুরনো স্মৃতি নিয়ে…
তখন কী করব?
— ওটাই স্বাভাবিক। ওনার মস্তিষ্কে বাস্তব আর স্মৃতি মিশে যাচ্ছে।
যদি পারেন, আপনি ওনার সঙ্গে বসে কথা বলবেন, ওনার কথা শুনবেন, আর কোনো কথা কাটবেন না—মানে
কনট্রাডিক্ট করবেন না। বলতে দিন। ধীরে ধীরে অন্যদিকে মনটা ঘোরাবেন। ওনার একটা
পারসিকিউশন কমপ্লেক্স আগের থেকেই আছে। আমি শেষ যে বার ওনাকে দেখেছিলাম, তখনই লক্ষ্য করেছিলাম। ওনাকে সেফ ফিল করাবেন।
— আচ্ছা… যতটা সময় পাই…
আমি চেষ্টা করব। আমি তো অনেক সময় থাকতে পারি না কাকুর সাথে। আয়াগুলো থাকে।
কিন্তু ওরা ওদের যতটুকু কাজ, সেটুকুই করে। তাও… আমি যতটা
পারি দেখব।
— হ্যাঁ, দেখুন। আসলে উনি খুব একাকীত্বে ভোগেন। হাঁটাচলা রেস্ট্রিক্টেড হয়ে
যাওয়ায় আরও এটা বেড়েছে। আগে তো পার্কে যেতেন, শুনেছি। যদি
ওনাকে নিয়ে একটু বেরোনো যেত, ভালো হত। যাই হোক, দেখুন কী করা যায়। আর কোনো সমস্যা হলে যোগাযোগ করবেন।
— ঠিক আছে, ডাক্তারবাবু। আসি।
জয় কিছুক্ষণ পরে ঘরে ঢুকে দেখল, স্ত্রীর বাঁধানো ছবিটা খাটের পাশের টেবিল থেকে নিয়ে কাকু বুকে আঁকড়ে শুয়ে আছেন, চোখ বুজে। চোখের কোণে জল।
আয়াদের দু’জনের একজন ওষুধ কিনতে গেছে। আরেকজন আছে। সে বলল, মেসোমশাই আজ একেবারে খাওয়াদাওয়া করতে চাইছেন না। ওষুধও খেতে চাইছেন না। মাসিমার কথা বলছেন খালি, আর বলছেন “বাড়ি যাব, বাড়ি যাব।” ওই ছবিটা ধরে রেখেছেন—চাইলেও দিচ্ছেন না।
কেউ বুঝলো না যে চোখের জলটা দুঃখের নয়, আনন্দের।
Comments
Post a Comment