ভিখারী
“একটি পয়সা যদি পাওয়া যায় আরো—
তবে আমি হেঁটে চ’লে যাবো মানে-মানে।”
গত কয়েকদিন ধরে বিকেলের দিকে হাঁটতে বেরোচ্ছি। বাড়িতে বন্দী হয়ে থেকে হতাশা আসছিল। রোজ ছটা-সাড়ে ছটার দিকে হাঁটতে বেরিয়ে সোজা হাতিবাগান চলে যাই। মিনিট কুড়ি হাঁটি, তারপর বাড়ি চলে আসি। বেরিয়ে দেখি রাস্তায় প্রচুর লোকজন: কেউ গল্প করছে, কেউ ফাস্ট ফুড খাচ্ছে, অনেক প্রেমিক প্রেমিকাও দেখতে পাই – বুঝি, তারা তিন মাসের ওপর সময় একে অপরকে দেখতে না পেয়ে পাগল হয়ে যেতে বসেছিল, পারায় পারায় আড্ডা বসেছে, লোকে আগের মত রোয়াকে বসে আড্ডা দিচ্ছে। জমায়েত হবার উপলক্ষ চাই তাই ভারতীয় সেনা যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের সম্মান জানানোর জন্য বড় ফ্লেক্স টাঙিয়ে তার সামনে মোমবাতি জ্বালিয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে লোকজন। কেউ বলে না দিলে বোঝার উপায় নেই যে মহামারী চলছে। রোজ হাঁটবো বলে একজোড়া স্পোর্টস শু, একটা ট্র্যাক প্যান্ট আর সোয়েট শার্ট কিনেছি। বিকেল হলেই এসব পড়ে কেত মেরে হাঁটতে বেরোচ্ছি। প্রথম দিকে অনেকদিন না বেরোনোর ফলে পায়ে যন্ত্রণা হচ্ছিল। এখন দিব্ব্যি সয়ে গেছে।
পরশুদিন হেদুয়ার পাশ দিয়ে হাতিবাগানের দিকে যাওয়ার সময় স্কটিশ স্কুলের পাশে দেখলাম একটা বুড়ি বসে ভিক্ষা করছে। পরনে সাদা থান, শীর্ণকায় চেহারা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, সারা গায়ে শ্বেতি। দেখে খুব মায়া হলো। ইচ্ছে হলো কিছু টাকা দিই, কিন্তু সাথে টাকা ছিল না। (ট্র্যাক প্যান্টে মানিব্যাগ রাখলে অহেতুক ভারী হয়ে যায় আর হাঁটতে অস্বস্তি হয় বলে সঙ্গে নিই না)। ঠিক করলাম পরের দিন কিছু টাকা নিয়ে আসবো সাথে। তার পরের দিন, অতয়েব গতকাল, কিছু টাকা সঙ্গে করে নিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখলাম, আগের দিনের মতনই বুড়ি সেখানে বসে আছে, আপনমনে পয়সা গুনছে। আমি তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। কেউ সামনে দাঁড়িয়েছে বুঝেই instinctively সে তার হাতটা বাড়িয়ে দিলে - ভিখারীরা যেটা প্রায়ই করে। মাথা নিচু করে হাত পেতে ঘার গুঁজে বসে থাকে। আমি তার হাতে কয়েনের বদলে একটা বড় নোট দিতে সে অবাক হলো আর খুব আস্তে মাথা তুলে আমায় দেখলো, তারপর অস্ফুট স্বরে কিছু বলল আর নোটটা স্বযত্নে যে কাপড়টা পেতে বসেছিল, তার তলায় রেখে দিল।
খুব ছোটবেলায় বাসে করে কোথাও যাওয়ার সময় একটা ভিখারীর ডাককে নকল করার জন্য বাবার কাছে খুব বকুনি খেয়েছিলাম। বাবা বলেছিল, ‘সব সময় মনে রাখবে, কারুর কাছে হাত পাতা সহজ কাজ নয়, যে এটা করছে, তার নিশ্চই খুব কষ্ট, তাই করছে।’ পরে, তখন একটু বড় হয়েছি, একদিন দেখি পাড়ার মন্টুকাকু চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন। কথা শুনে বুঝলাম যে তাঁর খুব অভাব তাই তিনি তাঁর ছোটবেলার এক বন্ধুর সল্টলেকের প্রাসাদোপম বাড়িতে গিয়েছিলেন কিছু টাকা ধার করতে, কিন্তু গেটম্যান তাঁর ছাপোষা পোশাক আর ছেঁড়া চপ্পল দেখে তাকে ঢুকতেই দেয় নি; অনেক বলার পর গেটম্যান তাঁর বন্ধুকে খবর দিলেও, বন্ধুটি দেখা করতে রাজি হয় নি। ছোটবেলায় বাবার বলা কথাটা মনে পড়ে গিয়েছিল। মধ্যবিত্ত ঘরের লোকের পক্ষে কারুর কাছে হাত পাতা বুঝি আরো কঠিন কারণ সে ভিখারী নয়।
ট্রেনে বাসে কত ধরনের ভিখারী দেখা যায়। কেউ গান করে, কেউ করুন স্বরে ডাকে, কেউ বা চুপ করে হাত বাড়িয়ে দেয়। কেউ কেউ মদ খাবে বলে পিতৃহীন বা মাতৃহীন সেজে ভিক্ষা করে, কেউ ল্যাংড়াতে ল্যাংড়াতে বাসে ওঠে আর বাস থেকে নেমে স্বাভাবিক ভাবে হেঁটে চলে যায়, কেউ বা সত্যিই প্রতিবন্ধী। হিজরেরা ভিক্ষা করে, ভিক্ষা না দিলে চরম গালি দিয়ে বাপ-মায়ের নাম ভুলিয়ে দেয়। ট্রেনে ঘুমন্ত, নির্জীব শিশু-কোলে কিছু কম বয়সী মেয়ে ভিক্ষা করে, কিছু বাচ্ছা ছেলে-মেয়ে কাঠের এক ধরনের যন্ত্র বাজিয়ে টক-টকা-টক শব্দ করে গান করে। (ছোটবেলায় আমার ওগুলো দেখে খুব লোভ হতো, বাজাতে ইচ্ছে করত) কেউ কেউ গায়ে নামাবলী চাপিয়ে একটা থালায় মা-কালির ছবি, জবাফুল আর কিছু পয়সা সাজিয়ে ভিক্ষা করে, কেউ আবার আল্লার দোয়া লাগবে বলে ভিক্ষা করে। সব ধর্মের ভিখারী রয়েছে, সব ধর্মেই ভিখারী রয়েছে, পৃথিবীর সব জায়গায় ভিখারী রয়েছে। খাবারের থেকে বড় ঈশ্বর হয় না। আমার এক মারোয়ারী বন্ধু গর্ব করে বলে যে মারোয়ারী বা সিন্ধিদের মধ্যে নাকি ভিখারী নেই। আমার বিশ্বাস হয় না। আমার খালি একটা কথা মনে হয়। ভিখারীরা তো আর গাছ থেকে এসে পড়ে নি। এরা সমাজের মধ্যে উচ্ছিষ্ট হিসেবে গন্য হয়। ইংরাজিতে যাকে বলে superfluous বা underclass। কেউ যদি ভিক্ষা করতে বাধ্য হয়, তার দায় সমাজব্যবস্থার, তার নিজের নয়।
যাই হোক। এতদিন লকডাউনের পর বাড়ি থেকে মাঝে মাঝে বেড়িয়ে নতুন সব উপলব্ধি হচ্ছে। ওই বুড়ি ভিখারীটাকে টাকা দিয়ে একটা অদ্ভুত আনন্দ উপলব্ধি করলাম। ঠিক করেছি ওই পথে গেলে, প্রতিবারে ওকে অল্প কিছু টাকা দেবো। এক সাথে বেশি দিলে চুরি হয়ে যায় যদি! খুব ছোটবেলায় আশাপূর্ণা দেবীর একটা ছোটগল্প পরেছিলাম, নামটা মনে নেই। অনেক পরে সেই গল্পটার সারসংক্ষেপ ইংরাজিতে অনুবাদ করে পাঠিয়েছিলাম আমার এক পোলিশ বন্ধুকে, যেটা এখানে copy-paste করছি:
It is a story about a little beggar girl who finds a hundred-rupee note one day while playing in the street. She has never seen a hundred-rupee note before and exhilarated though she is, she does not know what to do with it. Eventually, she decides to buy something with it. She thinks of a number of possibilities: food, clothes, toys, etc. Her lack of experience and her fear that she will perhaps be accused of theft, keeps her from actually buying anything. She wanders the city streets for the whole day but is unable to decide what to do with the money. Exasperated after much roaming and looking at shop windows, she decides to return to her tent on street. It is almost evening and she notices another beggar girl across the street playing on the footpath. She walks up to her and gives her the money. The second beggar girl cannot believe at first what she has just received. She throws her hands in the air and makes a little dancing movement and then scuttles. The first beggar girl looks at her as she disappears round where the street bends, and it seems to her that nothing in the world could have bought her the joy she now feels. She smiles contentedly.
ছোটবেলায় অদ্ভূত সব প্রশ্ন মাথায় আসত আর সেসব করতাম একমাত্র বাবাকে। বাবা খুব ধৈর্য নিয়ে উত্তর দিত সেসবের। নতুন কোনো শব্দ শিখলে বাবাকে বলতাম। অনেক সময় নতুন শব্দ বানাতাম। (ইংরিজিতে coin কথাটার মধ্যে অদ্ভূত এক ব্যঞ্জনা লুকিয়ে রয়েছে, যেটা এই লেখার ক্ষেত্রে তাত্পর্যপূর্ণ।)‘আনন্দে আত্মহারা’ কথাটা প্রথম শেখার পর মনে হয়েছিল, আনন্দে মানুষ কেন আত্মহারা হয়, দুঃখে তো কেউ আত্মহারা হয় না। বাবা বলেছিল, আনন্দ মানুষকে নিজের বাইরে বেরিয়ে অন্য মানুষের সাথে নিজের মনের অবস্থা ভাগ করে নিতে সাহায্য করে, আর দুঃখ মানুষকে সচরাচর খুব একা আর নিজের মধ্যে বন্দী করে দেয়। পরে ecstasy কথাটার উৎপত্তি দেখতে গিয়েও একপ্রকার মানেগত মিল আবিষ্কার করেছিলাম:
ecstasy (n.)
from the Ancient Greek ἔκστασις ekstasis, "to be or stand outside oneself, a removal to elsewhere" from ek- "out," and stasis
নিজের বাইরে বেরিয়ে যে আনন্দ পাওয়া যায় এখন তা কিছুটা নিজের বাড়ির বাইরে বেড়িয়ে পাওয়া আনন্দের সাথে সমার্থক হয়ে গেছে। হয়ত নিজেকে চেনার জন্যও এই বেরোনোটা কিছুটা আবশ্যক।
অভিরূপ
Ek nissashe pore fellam! Kichu bangla banan bad diye chomotkar jhorjhore!
ReplyDeleteDarun👌
ReplyDelete🙏🏻👌
ReplyDeleteতোমার লেখার style বেশ অনন্য। আসলে এর একটা আশ্চর্য দিক হলো, লেখার বিষয় অনুযায়ী তোমার লেখার style পাল্টে যায়! এই লেখাটা পড়ে লীলা মজুমদার আর প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর লেখা মনে পড়ে গেল। যদিও তোমার লেখা ওদের থেকে আলাদা।
ReplyDeleteখুব ভালো লাগল পড়ে। গরীব মানুষ কে এরকম help করে যা। আর এরকম আরো লেখ। আঁকার মতো তোর লেখার হাতটাও বেশ ভালো
ReplyDeleteThis comment has been removed by the author.
ReplyDeletePS: Tomar ecstasy'r
ReplyDeleteoriginal Greek explanation ta awshadharon laaglo -- aagey jantam naa. Kintu ekta Robindrasangeet theke er shar mawrmo ta onekdin aagei onubhob korechhilam - khub kothin ekta shomoy par korte korte. Gaan ta tumi nishchoi jaano:
"আপনারে দিয়ে রচিলি কি এ/
আপনারই আবরণ/
খুলে দেখ দ্বার, অন্তরে তার/
আনন্দ নিকেতন।"
এই গানের শেষে একটা রহস্যময় line আছে:
"ভিক্ষা না নিবি, তখনি জানিবি/
ভরা রবে তোর ধন"
এই line gulo আমি অনেক পরে নিজের মতো করে আত্মস্হ করেছিলাম। তোমার লেখা পড়ে ভাবছি ওই "ধন" টুকু হারায় বলেই কি হাত পাতা এত কঠিন?