ইরফান, তোমাকে...

প্রিয় ইরফান,

এখন রাত প্রায় একটা। আজ কি বার জানিনা। বন্দিদের দিনের, তারিখের হিসেব থাকে না। তবে আজকের তারিখটা মনে থাকবে। ২৯শে এপ্রিল। আজ অনেক কাজ ছিল, কিছুই হলো না। জানালার বাইরে, কিছুটা দূরে যে আমগাছটা রয়েছে, সেটার দিকে তাকিয়ে, আর আরেকটু দূরে যে নতুন ফ্ল্যাটটা উঠছিল, আর উঠতে উঠতে যেটা লকডাউনের চক্করে থমকে গেছে, সেটার দিকে তাকিয়ে সারাদিন কেটে গেল। এখন অনেক রাত। ঘুম আসছে না, তাই তোমায় একটা চিঠি লিখতে বসলাম। বাংলাতেই লিখছি। তোমার বউয়ের নাম দেখলাম সুতপা শিকদার - কিছুটা বাংলা হয়তো তুমি জানো।

আমি তোমার সব ছবি দেখিনি, যেরকম জগজিৎ সিং-এর সব গান শুনিনি। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। তোমরা ঘরের লোক। আমি সিনেমা দেখছি সেই কোন ছোটবেলা থেকে। দেশী, বিদেশি নিয়ে অগুনতি ছবি দেখা হয়েছে। কিন্তু আজ অবধি আর কোনো অভিনেতাকে দেখে মনে হয়নি সে ঘরের লোক, দাদা, বা বন্ধু। আজ অবধি কাউকে দেখে মনে হয়নি তাকে বাড়িতে এনে ঘণ্টার পর ঘন্টা গল্প করি। সিনেমা নিয়ে নয় - সাধারণ জীবন নিয়ে, বড় হয়ে ওঠা নিয়ে, শখ সাধ আহ্লাদ ও খাওয়া দাওয়া নিয়ে। জানি, এরকম মনে হওয়া খুব অদ্ভুত। কিন্তু কি জানো, আজকে তোমার চলে যাওয়া নিয়ে যে ক'জন বন্ধুর সাথে কথা বললাম, প্রায় সকলেই একই কথা বললো, যে তারা ঘরের লোককে হারিয়েছে। কিন্তু ঘরের লোক কারা? তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: এই ঘরটাই বা কি?

আমি মাঝে মাঝে কল্পনা করি এই ঘরটাকে, যেখানে দেশ-কাল-সময়ের সীমা ঘুচে গেছে। ইতিহাসের বিভিন্ন সময় থেকে বিভিন্ন মানুষজন উঠে এসে এই ঘরটাতে আশ্রয় নিয়েছে। এরা অধিকাংশই শিল্পী। এদের সাথে কখনোই আমার দেখা হয়নি কিন্তু এরা আমার আপনজন। এদেরকে পেলে আমি রেঁধে খাওয়াতাম, বাতাস করতাম, বলতাম, দু দন্ড জিরিয়ে নাও। কয়েকদিন আগে আইরিশ ব্যান্ড The Cranberries-এর লিড সিঙ্গার Dolores O'Riordan-এর কথা পড়তে গিয়ে জানতে পারলাম উনি ছোটবেলায় abused হয়েছিলেন। ওনার ছোটবেলা ও বড় হয়ে ওঠার ব্যাপারে পড়তে পড়তে, আর ওনার গাওয়া Linger গানটা শুনতে শুনতে চোখে জল এসে গিয়েছিল। যেরকম এসেছিল Don McLean-এর Vincent গানটা শুনে van Gogh-এর কথা মনে করে। বাসে করে অফিস থেকে বাড়ি ফেরার সময় ওই গানের এই লাইনগুলো শুনে চোখ ভিজে গিয়েছিল নিজের অজান্তেই:

Now I think I know
What you tried to say to me
And how you suffered for your sanity
And how you tried to set them free
They would not listen, they're not listening still
Perhaps they never will.

ছোটো ভাই Theoকে লেখা van Gogh এর একটা চিঠির লাইনও মনে পড়ে গিয়েছিল: "The more ugly, old, nasty, ill, and poor I become the more I want to get my own back by producing vibrant, well-arranged, radiant colour."

যাই হোক, এই ঘরটায় আরো কয়েকজন উপস্থিত। যেরকম, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তুলসী চক্রবর্তী, Ludwig van Beethoven... এরা প্রত্যেকেই চূড়ান্ত অভাব বা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে থেকেও শিল্পচর্চা চালিয়ে গেছেন। অভাব কথাটা বলতে সাধারণত আর্থিক অভাবকেই বোঝানো হয়, কিন্তু এই সব শিল্পীদের অর্থকষ্ট থাকলেও ভালোবাসার অভাব হয় নি, যে ভালোবাসা তারা তাদের কাজের প্রতি, জীবনের প্রতি, চারপাশের মানুষ ও সমাজের প্রতি উজাড় করে দিয়েছেন। এই ঘর যেটায় এনারা রয়েছেন, সেটা আসলে একটা পৃথিবী। এখানে তুলসী চক্রবর্তী নিদারুণ অভাবের তাড়নায় ফিল্মে ছোট পার্ট খোঁজেন আর খুঁজে পেলে, পরের একশো বছর ধরে দর্শকদের হাসান। আমি অঙ্কে বরাবরই কাঁচা। তবু, স্কুলে একবার কিভাবে যেন অঙ্কে একশতে পঁচানব্বই পেয়ে গিয়েছিলাম। পাওয়ার পর পরশপাথরের তুলসিবাবুর মতো হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলেছিলাম। এই ঘরে গভীর রাতে Beethoven শ্রবণশক্তি হারানোর যন্ত্রণায় পিয়ানোর রীডে সজোরে আঘাত করে তার ওপর মাথা রেখে নিজের বাজনা শোনার চেষ্টা করেন। একটা গোটা সিম্ফনি বা কনসার্ট কি পুরোপুরি মাথায় compose করা যায়? এই ঘরে বসে Beethoven তার মাথার মধ্যে চলতে থাকা "unheard melodies" শোনেন। এখানে বিভূতিভূষণ পাড়ি দেন সুদূর আফ্রিকায়; হতাশা ও অভাবের মধ্যেও মানুষের কল্পনা যে কতদূর যেতে পারে তার নিদর্শন রাখেন লেখার পর লেখায়। আমার এক দাদা একবার বিভূতিভূষণের ব্যাপারে একটা কথা বলেছিল। বিভূতিভূষণ নাকি কোনো আড্ডার ঠেকে গেলে চা খেতেন না, অন্য কেউ খাওয়ালেও খেতেন না, পাছে তাকেও একদিন খাওয়াতে হয় অন্যদের। আসলে তাঁর কাছে চা খাওয়ার বা খাওয়ানোর পয়সা ছিল না। শিয়ালদায় বঙ্গবাসী কলেজের সামনে একটা চায়ের দোকান আছে যেখানে খুব ভালো লেবু চা পাওয়া যায়। ওখানে বসে লেবু চা খেতে খেতে আমার অনেকবার ইচ্ছে হয়েছে বিভূতিভূষণকে চা খাওয়াতে। এই ধরণের পাগলামির কথা share করার লোকগুলো কমে যাচ্ছে। ' Share' শব্দটার মানেই বদলে গেছে এখন।

ইরফান, জানিনা কেন আমার মনে হয়, তোমাকে এসব বলতে পারতাম। তুমি বুঝতে। জীবন সব সময়ই প্রতিকূল, কিন্তু এর মধ্যেও শিল্পচর্চা করে যাওয়া ছাড়া, ভালো থাকা ছাড়া উপায় নেই - এটা তোমার থেকে ভালো কেউ জানতো না। Life of Pi-এর শেষ দৃশ্যে যেরকম রিচার্ড পার্কার অবশেষে জঙ্গলের মধ্যে তার আশ্রয় খুঁজে পেলো, আমার কথাগুলো হয়তো তোমার আর আমার গল্পে আশ্রয় খুঁজে পেতো। তোমার চোখ দুটো খুব মনে পড়ছে। পিকু ছবিতে বেনারসের ঘাটের একটা দৃশ্য ছিল। রাতের দৃশ্য। আমার এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, ওই রাতের অন্ধকারের ওপার থেকে তুমি তাকিয়ে আছো। তোমার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। এই ঘরটা, যেখানে বাকিরা রয়েছেন, সেটাও যেন এখন অন্ধকারাচ্ছন্ন। রাত হয়েছে বা লোডশেডিং। আর অন্ধকারের মধ্যে তোমার চোখ দুটো স্রেফ দেখা যাচ্ছে। Listening pair of eyes।

জীবনের খুব কঠিন সময়ে পীট সিগারের গান আমায় শান্তি দিয়েছে। শুধু গান নয়, কণ্ঠস্বর। পীট সিগারের কণ্ঠস্বর আমার কাছে প্রচন্ড গরম দুপুরে বটগাছের ছায়ার মতো। অসম্ভব শান্ত, শীতল অথচ বলিষ্ঠ ও একরোখা একটা গলা। উনি যতদিন ছিলেন, মনে হতো পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে এই কণ্ঠস্বরটা কথা বলছে, গান গাইছে, তা সে বয়সের ভারে যতই ক্ষীণ হয়ে যাক না কেন। তোমরা যারা চলে যাও, তারা এক-একটা পৃথিবী রেখে যাও। আর আমরা সেই পৃথিবীগুলোর অসংখ্য, অদৃশ্য আলপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে তোমাদের খুঁজি। কিন্তু পাই না। সোশাল মিডিয়ায় আজ তোমার obituary-র ছড়াছড়ি। তার মধ্যে দেখলাম একজন তেরশ শতাব্দীর ফার্সি কবি রুমির একটি কবিতার লাইনের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। “Friend, our closeness is this: Anywhere you put your foot, Feel me in the firmness under you. How is it with this love, I see your world, but not you?” তোমার জগৎ, তোমার রেখে যাওয়া কাজ নিয়ে আজ সবাই নতুন করে চর্চা করছে। ছবিগুলো নতুন করে দেখছে। সেই ঘরের লোকটাকে খুঁজছে। কিন্তু পাচ্ছে না।

এক অদ্ভূত সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি আমরা। সবাই গৃহবন্দী আজ। এতটাই, যে 'গৃহ' শব্দটাই তার মানে হারাতে চলেছে। কলকাতা শহরে বসে এই চিঠি লিখছি, কিন্তু বহুদিন শহরটাকে দেখিনি। এই মুহূর্তে চার দেওয়ালের মধ্যে বসে কলকাতায় থাকা আর নিউ ইয়র্কে থাকা একই ব্যাপার। সবাই আজ 'এক ঘরে'। শুধু ঘরের লোকটাই নেই।

Life of Pi-এর শেষ লাইনগুলোই আজ মনে পড়ছে বারে বারে: "I suppose in the end, the whole of life becomes an act of letting go, but what always hurts the most is not taking a moment to say goodbye." আসলে চলে যাওয়াগুলো প্রায় সব সময়ই খুব unceremonious ।
তবুও... একরাশ অভিমান জমে আছে সবার মধ্যে, ইরফান।

                                                                                                                                      ভালো থেকো।

                                                                                                                                                      ইতি,
                                                                                                                                                           অভি

Comments

  1. ঘরের মানুষদের ঘরে ফেরার পালা এক অন্য সময়ের স্বর।

    ReplyDelete
  2. Sir lekha ta pre Mon chuye gelo

    ReplyDelete
  3. Khub bhalo laglo. Moner manusher moner moto lekha.

    ReplyDelete
  4. মন টা ছুঁয়ে গেল রে।

    ReplyDelete
  5. অসাধারণ লাগলো অভি দা

    ReplyDelete
  6. The feelings which you have shared in this letter is just impeccable. 😔😔

    ReplyDelete
  7. Gharer manushti nei aj. Kemon jani mone hochche hothat abar ashbe, abar dekhte parbo she chokhgulo ja dekhle mone hoto she shonar bojhar cheshta korbe.
    Khub bhalo likhechho.

    ReplyDelete
  8. Unbelievable...যদিও তোমার জন্য এই কথাটা প্রযোজ্য নয়... আজ পৃথিবী আমাদের ঘরে। পৃথিবী বদলে গেছে। সমস্তই রূপ রং বদলেছে। বদলায়নি এই চিঠির লেখক। যার কলমকে আখর দেয় তার ভাষা।। তার অবসরের অবসর নেই, মূহুর্তের মূহুর্ত নেই,, তাই 'unbelievable' বলা। তুমি ই পারো একজন বিখ্যাত ব্যক্তিকে বলতে ঘরের মানুষ, কাছেরজন... অনেক আশীর্বাদ রইল... ভালো থেকো অভি।।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ট্রেন লেট

রুনু